হাওর রক্ষার নামে বাঁধ বাণিজ্য! ১৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে পাউবো–কৃষি বিভাগের ৫০ কর্মকর্তা দুদকের নজরে
হাওরের ফসল রক্ষার নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়াবহ অনিয়ম, দায়সারা নির্মাণ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জে। বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর–এর অন্তত ৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ।
অভিযোগটি পাঠানো হয় দুদকের সিলেট সমন্বিত কার্যালয়ে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ফসলরক্ষা বাঁধ প্রকল্পকে পরিকল্পিতভাবে ‘লুটপাটের প্রকল্পে’ রূপ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বাঁধ নির্মাণের নামে অপরিকল্পিত প্রকল্প অনুমোদন, সময়মতো কাজ শেষ না করা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতির নিয়ন্ত্রিত চক্রে পরিণত হয়েছে। এর সরাসরি ফল হিসেবে সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ১২ উপজেলায় প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের আওতায় ৬০২ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, বহু প্রকল্পে ৩০ শতাংশ কাজও সম্পন্ন হয়নি। পাহাড়ি ঢলের চাপ সহ্য করার আগেই ভেঙে পড়ে দুর্বল বাঁধ, ডুবে যায় পাকা ধান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, যেখানে প্রকল্পের প্রয়োজন ছিল না সেখানেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক অক্ষত বাঁধকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ছাড় করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সুবিধাভোগীদের মাধ্যমে পিআইসি গঠন করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠে এসেছে।
মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দাবি, অনেক স্থানে বালু ও কাঁদামাটি দিয়ে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। কোথাও পুরোনো বাঁধের মাটি কেটে পুনরায় ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। অন্তত ১১০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজারের কাজ যথাযথভাবে শেষ না হওয়ায় হাওরের সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার ও মো. ইমদাদুল হকসহ প্রকৌশল, হিসাব ও কারিগরি শাখার একাধিক কর্মকর্তা। একই সঙ্গে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের নামও অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রকল্প নির্ধারণের আগে গণশুনানি করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি। প্রশাসন, পাউবো কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী পুরো প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগের কপি দেখা গেলেও এতে নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প বা কাজের বিস্তারিত উল্লেখ নেই। তার দাবি, হয়রানির উদ্দেশ্যে অনেক কর্মকর্তার নাম যুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর জেলার ১৩৭টি হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান। কিন্তু বাঁধ নির্মাণে অব্যবস্থাপনা ও বিলম্বের কারণে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ কেবল প্রকল্প নয়—এটি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। সেখানে দুর্নীতি মানেই জাতীয় অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদনের ওপর সরাসরি আঘাত।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ভয়াবহ হাওরডুবির পর দায় নির্ধারণে একাধিক মামলা হলেও সেগুলোর বিচার এখনও শেষ হয়নি। নতুন করে ওঠা এই অভিযোগ আবারও প্রশ্ন তুলেছে—হাওর রক্ষার প্রকল্প কি বারবার একই দুর্নীতির চক্রে বন্দি হয়ে পড়ছে?