নকশা জালিয়াতিতে রাজউক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা: অনুমোদনেই অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্নে ভবন তদারকি ব্যবস্থা
রাজধানীর উত্তরখান এলাকায় নকশাবহির্ভূত বহুতল ভবন নির্মাণে প্রশাসনিক যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর সাবেক পাঁচ কর্মকর্তাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসায় রাজধানীর নির্মাণ তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মানসী বিশ্বাস বাদী হয়ে গত ১১ মার্চ মামলাটি দায়ের করেন। সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মামলার আসামিরা হলেন—রাজউকের সাবেক অথরাইজড অফিসার সরদার মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, সাবেক ইমারত পরিদর্শক মো. নাজিম উদ্দীন, সাবেক প্রধান ইমারত পরিদর্শক শাহজাহান খান, সাবেক সহকারী খাইরুজামান, সাবেক প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. মামুনুর রশীদ এবং ভবন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে নকশা অনুমোদনের শর্ত লঙ্ঘন করে মাঠ শ্রেণির জমিতে একটি বেজমেন্টসহ ১০ তলা আবাসিক ভবনের লে-আউট নকশা অনুমোদন দেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত অবস্থা গোপন রেখে মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
তথ্য বলছে, সংশ্লিষ্ট জমির শ্রেণি ও ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই ছাড়াই ভবন অনুমোদন দেওয়া হয়, যা নগর পরিকল্পনা নীতিমালা এবং নির্মাণ বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। প্রশ্ন উঠছে—যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অবৈধ নির্মাণ ঠেকানো, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই যদি অনুমোদনের পর্যায়ে অনিয়মে জড়ান, তাহলে রাজধানীতে অবৈধ ভবনের বিস্তার কীভাবে থামবে?
সূত্র জানায়, অনুমোদনের আগে মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন না করে নথিতে ভিন্ন তথ্য উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরিকল্পিতভাবে নিয়ম শিথিল করে ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, উত্তরখান এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নকশাবহির্ভূত ভবন দ্রুত বাড়ছে। অপরিকল্পিত বহুতল নির্মাণের ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, অগ্নি নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে এবং বসবাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়ছে। তাদের প্রশ্ন—অনুমোদন না থাকলে এসব ভবন দাঁড়ায় কীভাবে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা দায়ের হওয়া মানে অভিযোগগুলো গুরুতর অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার পর্যায়ে পড়ছে। তারা বলছেন, শুধু ভবন মালিক নয়—অনুমোদন প্রদানকারী কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ করাই নগর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মূল শর্ত।
নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজধানীতে অবৈধ ও নকশাবহির্ভূত ভবন বৃদ্ধির পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং তদারকি ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকায় অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতি বছর শতাধিক ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে আইনি পদক্ষেপের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
দুদক সূত্র জানায়, মামলার তদন্তে অনুমোদন প্রক্রিয়ার আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং নথিপত্র যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে সম্পদ অনুসন্ধান ও অতিরিক্ত অভিযোগও যুক্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা কেবল একটি ভবন অনুমোদনের ঘটনা নয়; বরং রাজধানীর নির্মাণ খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও প্রশাসনিক দায়মুক্তির সংস্কৃতির প্রতিফলন। এখন প্রশ্ন উঠছে—এই মামলা কি নজির হয়ে নগর উন্নয়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে, নাকি আগের মতোই তদন্তের গতি সময়ের সঙ্গে থেমে যাবে?