১২৭ কোটি টাকার পোল্ট্রি প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে আলোচনায় ড. সাজেদুল করিম সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) পোল্ট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (PSO) ও ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
দাপ্তরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি অ্যানিম্যাল নিউট্রিশন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ১৯৯৯ সালের ১২ আগস্ট তিনি রিসার্চ অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ১৯ জুন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (SO), ২০১০ সালের ১ আগস্ট ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (SSO) এবং বর্তমানে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক কোড BLRI 0038।
সূত্র জানায়, ২০১৯ থেকে ২০২৪ মেয়াদি ১২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার এই প্রকল্পটি পরবর্তীতে আরও দুই বছরের জন্য বৃদ্ধি করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, প্রকল্পের কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রমের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। রাসায়নিক দ্রব্য, গ্লাসওয়্যার, প্লাস্টিক কনজুমেবল ও গ্রাফিক্স সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাস্তব সরবরাহের তুলনায় কাগজে-কলমে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং কিছু পণ্য আদৌ ক্রয় না করেই ভুয়া বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্পের অগ্রগতিতে প্রশ্ন উঠেছে। ২১টি প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষের কাছাকাছি সময়েও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, গবেষণার পরিবর্তে অবকাঠামো নির্মাণে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সাভার, নীলফামারীর সৈয়দপুর ও রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে শেড নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়ন কাজ হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে এসব কাজে অতিরিক্ত ব্যয় এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহৃত হয়েছে।
আরও অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্প পরিচালক তার নন-টেকনিক্যাল স্ত্রীকে বাংলাদেশ জুট গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিজেআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি পাইয়ে দেন। পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপের অর্থ নিজের স্ত্রীকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি কেনা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি এবং স্ত্রীকে ল্যাব ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া নিজের শ্যালক, ভাগ্নিজামাই, বোনের বাসুরের ছেলে, ভাতিজির জামাত, ভাগিনা, মামাতো ভাইয়ের বউ, চাচাতো ভাই এবং বউয়ের বোনের দেবরসহ প্রায় ১৮–২০ জন নিকট আত্মীয়কে প্রকল্পে বিভিন্ন সুবিধাজনক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। টুঙ্গিপাড়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।
আরও বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনো বিগত সরকারের পক্ষে পোস্ট ও ছবি দৃশ্যমান রয়েছে, যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
একাধিক সূত্র জানায়, সরকার পরিবর্তনের পর অন্যান্য প্রকল্প পরিচালকদের অপসারণ হলেও এই প্রকল্পে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ রয়েছে।
তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়ার পর সাংবাদিকদের হুমকি এবং “আতঙ্কজনক পরিবেশ” তৈরির অভিযোগও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে বলে জানা যায়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরকারি আদেশ (GO 442) অনুযায়ী কিছু দাপ্তরিক কার্যক্রমের অনুমোদনের রেকর্ড রয়েছে।
একজন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “প্রকল্পের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিগত প্রভাব ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।”
একজন প্রশাসনিক পর্যবেক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, বড় প্রকল্পে একক সিদ্ধান্তকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় বাজেটের প্রকল্পে দুর্বল অডিট ব্যবস্থার কারণে অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়, তবে প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই ছাড়া সত্য হিসেবে গণ্য করা যায় না।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্র জানায়, অভিযোগ এলে প্রাথমিক যাচাই করা হয়, তবে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়া সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব নয়।
বিএলআরআই বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পটি এখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখন পর্যন্ত উত্থাপিত কোনো অভিযোগই স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি।