ঢাকার মিরপুর বিআরটিএকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে পলাতক রাজনৈতিক নেতাদের বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে বদলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মো. হারুন অর রশিদ রুবেল নামে এক কথিত দালাল, যিনি কয়েক মাসেই কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধান বলছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতা আত্মগোপনে চলে যান বা দেশ ত্যাগ করেন। তাদের ফেলে যাওয়া ল্যান্ড ক্রুজার, প্রাডো, হ্যারিয়ার ও অডির মতো উচ্চমূল্যের গাড়িগুলো দ্রুত বিক্রির প্রয়োজন দেখা দিলে সেই সুযোগ কাজে লাগায় একটি চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে গাড়ি বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে রুবেল ও তার সহযোগীরা মালিকানা পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী, গাড়ির মালিকানা বদলের সময় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের উপস্থিতি, বায়োমেট্রিক তথ্য ও ছবি প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিক্রেতারা আত্মগোপনে থাকায় সেই প্রক্রিয়া সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় জাল স্বাক্ষর, ভুয়া হলফনামা এবং ব্যাকডেট নথি ব্যবহার করে গাড়ির ফাইল অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়ির মালিকানা বদলে দিতে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে।
‘নিয়ন্ত্রণকক্ষ’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, মিরপুর বিআরটিএর পাশের শাহরাস্তি বিজনেস সেন্টারের একটি অফিস থেকেই পুরো সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়। বাইরে থেকে এটি সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মনে হলেও, ভেতরে অবৈধ গাড়ি বেচাকেনা ও কাগজ জালিয়াতির কার্যক্রম চলত বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের নথিতে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দাম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকিরও অভিযোগ রয়েছে। কাগজে ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিটি সিএনজির বাজারমূল্য ছিল ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে।
সম্পদের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন
রুবেলের নামে রাজধানীর সেনপাড়া পর্বতায় একটি ফ্ল্যাট, শাহআলী প্লাজায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং একাধিক সিএনজি ও মাইক্রোবাসের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তার স্ত্রী তানিয়া আক্তারের নামেও অন্তত আটটি সিএনজির মালিকানার তথ্য রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদ অবৈধ আয়ের টাকায় গড়ে তোলা হয়েছে।
অভিযোগে নীরব রুবেল
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মো. হারুন অর রশিদ রুবেল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফোনকলও কেটে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিআরটিএতে সেবা নিতে আসা সাধারণ গ্রাহক ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও মূল দালালচক্র বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করে বলছেন, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বিআরটিএকে ঘিরে দালালচক্র ও রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হতে পারে।