নিজস্ব প্রতিবেদক
হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজধানীতে মানববন্ধন করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একই সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী বলে উল্লেখ করা মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। মানববন্ধন থেকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহানের জবাবদিহি এবং তদন্তের দাবি জানানো হয়।
শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাব-এর সামনে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকরা কর্মসূচির শিরোনাম দেন— “প্রতিরোধযোগ্য হাম রোগে নিষ্পাপ সম্ভাবনাময় শিশু হত্যার জন্য দায়ী ইউনূস-নূরজাহান গংদের বিচার ও মৃত শিশুদের ক্ষতিপূরণের দাবি” এবং “জনস্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদ”।
মানববন্ধনে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেন। এ সময় সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো শিশুদের প্রতীকী প্রতিকৃতি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়।
বক্তারা অভিযোগ করেন, টিকা ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতার কারণে দেশে হাম পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি হিসাবে কয়েকশ শিশু মৃত্যুর তথ্য সামনে এলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। যদিও এসব বক্তব্যের স্বাধীন সরকারি যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী সাকিল আহমদ (অরণ্য)। তিনি বলেন, “সরকারি গাফিলতির কারণে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা মনে করি। এটি কেবল স্বাস্থ্য সংকট নয়, একটি মানবিক বিপর্যয়।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত পূর্বের টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
তবে ইউনিসেফ UNICEF বা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেট চৈতালি চক্রবর্তী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খায়ের উদ্দিন শিকদার দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাংবাদিক হাসান আহমেদও স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সমাজকর্মী শাহরিয়ার নাফিস জয় সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, “দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)-এর একাংশের কোষাধ্যক্ষ সোহেলী চৌধুরী। তিনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিতের আহ্বান জানান তিনি।
মানববন্ধনে নাট্যজন এহসানুল আজিজ বাবু, শান্তা ফারজানা, মোমিন মেহেদী, অভিনেতা রূপক দেহলভি এবং সাংবাদিক মাজহারুল ইসলাম মাসুমসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।
শাহজাহানপুর থেকে আসা দিনমজুর মোক্তার হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন, “আমার আত্মীয়ের একটি শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। কেন টিকা সংকট তৈরি হলো, তার জবাবদিহি হওয়া উচিত।”
মানববন্ধন থেকে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল— টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার তদন্ত, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার এবং শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা।
কর্মসূচির শুরুতে অভিনেতা জুটন দাশের আহ্বানে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কবি কুতুব হিলালি। মূল দাবিগুলো উপস্থাপন করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কলাম লেখক এস এম কামরুজ্জামান সাগর।
সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।