স্টাফ রিপোর্টার
দেশে নীরবে বিস্তার ঘটছে ডার্ক ওয়েবভিত্তিক ভয়ংকর মাদক কারবার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে গোপন অনলাইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ করছে কিটামিন, এলএসডি ও ডিওবির মতো উচ্চমাত্রার মাদক। একই সঙ্গে এসব মাদক বিদেশেও পাচার হচ্ছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানবন্দর ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের প্রচলিত স্ক্যানিং ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে মাদক আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। ফলে প্রচলিত নজরদারি পদ্ধতিতে এসব চালান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মাদক লেনদেনে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। গোপন ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হওয়ায় অপরাধীদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ডার্ক ওয়েবভিত্তিক মাদক কারবারের মাত্র তিনটি বড় চক্র শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাই এর অন্যতম কারণ।
ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানান, ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক অপরাধ শনাক্তে মোবাইল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে ডিজিটাল ডিভাইস বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাদক চক্র শনাক্ত করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ২৫ মার্চ রাজধানীর একটি ভাড়া বাসায় পরিচালিত অভিযানে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন জব্দ করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিদেশ থেকে মাদক সংগ্রহ করত এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করত।
ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিশেষ ‘কি-ওয়ার্ড’ শনাক্ত করার মাধ্যমে সন্দেহজনক ক্রিপ্টো লেনদেনের সূত্র পাওয়া যায়। সেই সূত্র অনুসরণ করেই মাদক নেটওয়ার্কের সন্ধান মেলে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে ব্লুটুথ স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ভেতরে লুকিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো। পুরো লেনদেন পরিচালিত হতো ‘ট্রন’ নেটওয়ার্কভিত্তিক ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে।
এর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এলএসডিসহ এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার মোবাইল ও ল্যাপটপের ফরেনসিক বিশ্লেষণে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে মাদক অর্ডার ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য পরিশোধের প্রমাণ পাওয়া যায়।
২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় পরিচালিত আরেক অভিযানে পোল্যান্ড থেকে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে আনা ডিওবি ও এলএসডি জব্দ করা হয়। ওই ঘটনাতেও একই ধরনের ক্রিপ্টো লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
ডিএনসির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তারদের একজন পেশায় গ্রাফিক্স ডিজাইনার ছিলেন। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ডলারে আয় করা অর্থ বিটকয়েনে রূপান্তর করে মাদক আমদানিতে ব্যবহার করা হতো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনভিত্তিক মাদক কারবার দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল এখনও পর্যাপ্ত নয়। অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া ডার্ক ওয়েবভিত্তিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে পরিচালিত এই মাদক কারবার দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।