গাজীপুর জেলা পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে ঘিরে নতুন করে দুর্নীতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রশাসনিক পরিবর্তন, সাম্প্রতিক বদলি এবং সম্ভাব্য ফরেনসিক অডিটের খবর প্রকাশ্যে আসতেই প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে অস্বস্তি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে জেলা পরিষদের ভেতরে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়, যারা নীরবে নিয়ন্ত্রণ করত টেন্ডার বণ্টন, জমি লিজ বন্দোবস্ত, প্রকল্প অনুমোদন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের আর্থিক প্রবাহ। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এই বলয়ের অঘোষিত প্রভাব ছিল দৃশ্যমান।
তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে জেলা পরিষদের অন্তত ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ফরেনসিক অডিটের আলোচনা শুরু হতেই দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মচারীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপতৎপরতায় জড়িয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে প্রশাসনের ভেতর থেকেই।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন প্রায় ৩৪ বছর একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, চাকরিজীবনের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে কাপাসিয়ায় জমি, গাজীপুরে বহুতল ভবন এবং রাজধানীর উত্তরায় ফ্ল্যাটসহ একাধিক সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। বদলির আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে রিট দায়েরের বিষয়টিও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র জানায়, শর্টলিপিকার প্লাবন আলী প্রায় ১৭ বছর একই কর্মস্থলে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, গাজীপুরের ছায়াবীথি এলাকায় ফ্ল্যাট, শেরপুরে বাগানবাড়ি এবং বিভিন্ন জেলায় সম্পদ বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে—সরকারি বেতন কাঠামোর বাইরে এসব সম্পদের উৎস কী?
সার্ভেয়ার রেজওয়ানুল হকের বিরুদ্ধে জমি লিজ বন্দোবস্তে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং ঠিকাদার সুবিধা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজীপুর শহরের হায়দ্রাবাদ এলাকায় ‘অঙ্গনা’ নামে একটি রিসোর্ট, টঙ্গীতে বহুতল বাড়ি এবং দক্ষিণ ছায়াবীথিতে ফ্ল্যাট রয়েছে তার নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটভুক্ত কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে যৌথভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসাও পরিচালনা করছেন তিনি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিম্নমান সহকারী রিনা আক্তার প্রায় ২৫ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে গাজীপুর শহরের রাজদীঘির পশ্চিম পাশে আটতলা ভবন নির্মাণ করেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠছে। একইভাবে উচ্চমান সহকারী আল আমিনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকায় একাধিক সম্পত্তি অর্জন এবং সিন্ডিকেটের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, রফিকুল ইসলাম রফিকের বিরুদ্ধেও গাজীপুর শহরে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি নির্মাণ, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ এবং প্রকল্প বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া উপসহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন, নিম্নমান সহকারী হারুন অর রশিদ, পিয়ন সোনিয়া আক্তার ও ড্রাইভার মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদ অর্জন ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত আলোচনায় এসেছে বলে প্রশাসনিক সূত্র জানায়।
ভুক্তভোগী কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, জেলা পরিষদের নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মচারীর অনুমোদন ছাড়া কোনো কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তাদের ভাষায়, “টেন্ডার জমা দেওয়া ছিল আনুষ্ঠানিকতা, সিদ্ধান্ত হতো আগেই। কমিশন না দিলে কাজ পাওয়া যেত না।”
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দুই দশকে জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলেও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি—যা নিয়ে স্থানীয় নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন তুলে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘসময় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারি এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার অভাব—এই তিন কারণ মিলেই অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সংস্কৃতি’ তৈরি হয়। স্থানীয় সরকার প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বদলি, সম্পদ বিবরণী যাচাই এবং স্বাধীন ফরেনসিক অডিট ছাড়া এ ধরনের বলয় ভাঙা কঠিন।
অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তবে সূত্র জানায়, তদন্ত প্রক্রিয়া এগোলে প্রকৃত আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস স্পষ্ট হতে পারে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, সম্ভাব্য অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ফরেনসিক অডিটের প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, “যে-ই অনিয়মে জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
সচেতন মহলের দাবি, শুধু বদলি নয়—গাজীপুর জেলা পরিষদের বিগত দুই দশকের টেন্ডার, জমি লিজ, উন্নয়ন প্রকল্প ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট প্রয়োজন। দুর্নীতি দমন কমিশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং স্বাধীন নিরীক্ষা সংস্থার সমন্বিত তদন্ত ছাড়া অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এখন প্রশ্ন উঠছে—চলমান তদন্ত কি সত্যিই দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী বলয় ভাঙতে পারবে, নাকি প্রশাসনিক চাপ ও প্রভাবের রাজনীতিতে আবারও চাপা পড়ে যাবে অভিযোগের পাহাড়?